যাকাত

যাকাতের পূর্ণাঙ্গ বিধান: হিসাব, ফজিলত, শাস্তি, প্রাপক ও অপ্রাপক – কুরআন ও হাদিসের আলোকে

যাকাত: ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ

সঠিক হিসাব, ফজিলত, শাস্তি, প্রাপক ও অপ্রাপক – কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা

ফরজ ইবাদত | ২.৫% হারে | ৮টি খাত
পড়তে সময়: প্রায় ১০-১২ মিনিট
📢

যাকাত কী ও কেন ফরজ?

যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের তৃতীয়। এটি সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য নির্ধারিত সম্পদের একটি অংশ যা নির্দিষ্ট ৮টি খাতে ব্যয় করতে হয়। কুরআনে নামাজের পরেই যাকাতের কথা অধিকাংশ স্থানে উল্লেখিত হয়েছে। যাকাত শব্দের অর্থ পবিত্রতা, বৃদ্ধি ও বরকত। আল্লাহ বলেন:

خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا

অর্থ: “তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ কর, যা দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ করবে।” (সূরা তওবা, ৯:১০৩)

যাকাত দারিদ্র্য দূরীকরণ, সম্পদে বরকত, ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম মাধ্যম। হাদিসে এসেছে: “ইসলামের ভিত্তি পাঁচটির উপর: সাক্ষ্য দেওয়া, নামাজ কায়েম করা, যাকাত দেওয়া, রমজানের রোজা ও হজ্জ করা।” (বুখারী ও মুসলিম)

যাকাত কিভাবে হিসাব করবেন? (বিস্তারিত)

নেসাব (যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত):

  • স্বর্ণ: ৭.৫ তোলা (৮৭.৪৮ গ্রাম) বা সমমূল্য
  • রুপা: ৫২.৫ তোলা (৬১২.৩৬ গ্রাম) বা সমমূল্য
  • নগদ টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স, ব্যবসায়িক পণ্য, শেয়ার, প্রাপ্য ঋণ ইত্যাদি যদি এক বছর মালিকানায় থাকে এবং নেসাব পরিমাণ হয়, তাহলে যাকাত দিতে হবে।

হার: মোট সম্পদের ২.৫% (চল্লিশ ভাগের এক ভাগ)।

যেসব সম্পদে যাকাত ফরজ: সোনা-রূপা, নগদ, বাণিজ্যিক পণ্য, পশুসম্পদ (গরু, ছাগল, উট), কৃষি ফসল (উসর ৫% বা ১০%), খনিজ সম্পদ, গৃহস্থালির অতিরিক্ত সম্পদ (গয়না ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে না হলে গয়নায় যাকাত ফরজ) ইত্যাদি।

সহজ হিসাব: (মোট সম্পদ – জরুরি ঋণ) × ২.৫% = যাকাতের পরিমাণ।

উদাহরণ: আপনার নগদ ৫,০০,০০০ + ব্যাংক ৩,০০,০০০ + স্বর্ণের মূল্য ২,০০,০০০ = ১০,০০,০০০ টাকা। ঋণ ১,৫০,০০০ টাকা। যাকাতযোগ্য সম্পদ = ৮,৫০,০০০ টাকা। যাকাত = ৮,৫০,০০০ × ০.০২৫ = ২১,২৫০ টাকা।

হাদিস: “যে স্বর্ণ-রুপার মালিক তাদের যথাযথ যাকাত আদায় করে না, কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত প্লেট দ্বারা দাগানো হবে।” (মুসলিম)

যাকাতের ফজিলত ও দুনিয়া-আখিরাতের উপকারিতা

আত্মিক পবিত্রতা

মানুষকে কৃপণতা থেকে মুক্তি দেয়, সম্পদে বরকত আনে।

সমাজের কল্যাণ

দারিদ্র্য বিমোচন, ঋণমুক্তি, গরিবের ভরণপোষণ নিশ্চিত করে।

দুনিয়ার বরকত

আল্লাহ যাকাতদাতার মালে বরকত দেন, ধ্বংস ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন।

আখিরাতের পুরস্কার

জান্নাত, জাহান্নাম থেকে নাজাত, আরশের ছায়া, পাপের কাফফারা।

مَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ

অর্থ: “যারা আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ সেই বীজের মতো যা সাতটি শীষ উৎপন্ন করে, প্রতিটি শীষে একশো দানা।” (সূরা বাকারা, ২:২৬১)

যাকাত না দিলে ভয়াবহ শাস্তি

যে ব্যক্তি বিনা ওজরে যাকাত দিতে অস্বীকার করে, কুরআন ও হাদিসে তার জন্য কঠিন আযাবের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ

অর্থ: “যারা স্বর্ণ ও রুপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।” (সূরা তওবা, ৯:৩৪)

হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি যাকাত দেয় না, কিয়ামতের দিন তার সম্পদ বিষধর সাপে রূপান্তরিত হয়ে তার গলায় জড়িয়ে ধরবে এবং কামড়াবে।” (বুখারী) আরেক হাদিসে: “যার কাছে যাকাত ফরজ হয় এবং সে তা আদায় না করে, মৃত্যুর সময় সে তার মালের অংশ না দেওয়ায় অনুতপ্ত হবে।”

যাকাত কারা পাবে? (কুরআনে বর্ণিত ৮টি খাত)

১. ফকির

যাদের আয় অর্ধেক প্রয়োজনের কম।

২. মিসকিন

যাদের কোনো কিছু নেই বা অর্ধেকের বেশি অভাব।

৩. যাকাত আদায়কারী

আমিল, যারা যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণে নিয়োজিত।

৪. নওমুসলিম

যাদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।

৫. দাসমুক্তি

ক্রীতদাস মুক্ত করতে, বর্তমানে বন্দী মুক্তির খাতে।

৬. ঋণগ্রস্ত

যারা ঋণের বোঝায় নিপীড়িত।

৭. আল্লাহর পথে

জিহাদ, দ্বীন প্রচার, ইসলামি শিক্ষা প্রসার।

৮. মুসাফির

পথে অর্থহীন অবস্থায় পড়া ভ্রমণকারী।

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ

(সূরা তওবা, ৯:৬০) – এই আয়াতে আল্লাহ যাকাতের আটটি খাত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

যাকাত নিতে পারে না যারা

  • যাকাতদাতার পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, সন্তান-সন্তুতি, নাতি-নাতনি।
  • স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে যাকাত দিতে পারে না।
  • বনী হাশেম (হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর বংশধর) – সম্মানার্থে যাকাত নিষিদ্ধ।
  • ধনী ব্যক্তি (নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক)।
  • সক্ষম, কর্মক্ষম ব্যক্তি যিনি উপার্জনে অক্ষম নন।

হাদিস: “যাকাত ধনীদের জন্য হালাল নয়, আর শক্তিশালী সক্ষম ব্যক্তির জন্যও বৈধ নয়।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)

যাকাতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব

যাকাত শুধু ব্যক্তির জাকাত নয়, বরং এটি একটি সমাজব্যবস্থা। এটি সম্পদের পুনর্বণ্টন করে, ধনী-গরিবের ব্যবধান কমায়, এবং সমাজে অপরাধের হার হ্রাস করে। ইসলামী অর্থনীতিতে যাকাতকে একটি ভূমিকা পালন করে যা বেকারত্ব, ঋণ ও দারিদ্র্যের সমাধান করে। নিয়মিত যাকাত দিলে সম্পদ প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, মুসলিম উম্মাহ শক্তিশালী হয়।

রাসুল (সা.) বলেছেন: “তোমাদের সম্পদের যাকাত তোমাদের মধ্যকার গরিবদের পরিশুদ্ধ করে দেয়।” (সহীহ ইবনে হিব্বান)

যাকাত সম্পর্কিত জ্ঞান পরীক্ষা (MCQ)

১. যাকাতের হার কত?

৫%২.৫%১০%১%
উত্তর দেখুন

২. কুরআনে যাকাতের কয়টি খাত বর্ণিত হয়েছে?

৫টি৬টি৮টি১০টি
উত্তর দেখুন

৩. স্বর্ণের নেসাব কত?

৫ তোলা৭.৫ তোলা১০ তোলা১২ তোলা
উত্তর দেখুন

৪. কোন শ্রেণি যাকাত গ্রহণ করতে পারে না?

মিসকিনমুসাফিরবনি হাশেমঋণগ্রস্ত
উত্তর দেখুন

৫. যাকাতের প্রাপ্তির খাতসমূহ কোন সূরায় বিস্তারিত আছে?

সূরা বাকারাসূরা তওবাসূরা হাশরসূরা মুজাদালা
উত্তর দেখুন

৬. ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত দেওয়া কি ফরজ?

হ্যাঁ, ফরজনা, সুন্নতশুধু রমজানেশুধু লাভের উপর
উত্তর দেখুন

উপসংহার

যাকাত আল্লাহর নির্দেশিত একটি চমৎকার ইবাদত, যা আর্থিক সাম্য ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে। নিয়মিত ও সঠিকভাবে যাকাত আদায় করলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়েই কল্যাণ লাভ করে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে যথাযথভাবে যাকাত প্রদানের তাওফিক দান করুন – আমিন।


© adstrra – সম্পূর্ণ মৌলিক, কপিরাইট মুক্ত। কুরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি নির্ভুল ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।
গুগল অ্যাডসেন্স নীতিমালা ও এসইও ফ্রেন্ডলি কন্টেন্ট। শেয়ার করুন ও সওয়াব অর্জন করুন।
Scroll to Top