আলেম ও জ্ঞানের গুরুত্ব

আলেম ও জ্ঞানের গুরুত্ব: কুরআন ও হাদিসের আলোকে

ভূমিকা: ইসলামের প্রথম বাণীই হলো জ্ঞান

মানব সভ্যতার ইতিহাসে ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা সূচনালগ্নেই জ্ঞানের জয়গান গেয়েছে। যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন আরবে মানুষ কুসংস্কার আর অনাচারে লিপ্ত ছিল, তখন জিবরাঈল (আ.) মহানবী ﷺ-এর কাছে যে প্রথম বাণীটি নিয়ে এসেছিলেন, সেটি ছিল— “ইকরা” অর্থাৎ “পড়ো”

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ (১) خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ (২) اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ (৩) الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ (৪) “পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়ো, আর তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।” — (সূরা আলাক: ১-৪)

এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামে ইবাদতের আগে জ্ঞানের স্থান। কারণ জ্ঞান ছাড়া ইবাদত অন্ধত্বের শামিল।

ইসলামে জ্ঞানের মর্যাদা ও ফজিলত

১. জ্ঞানী ও মূর্খ কি সমান?

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ۗ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ “বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান? মূলত বুদ্ধিমানরাই উপদেশ গ্রহণ করে।” — (সূরা যুমার: ৯)

২. জ্ঞানীদের উচ্চাসন প্রদান

يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদাকে অনেক উচ্চে তুলে ধরবেন।” — (সূরা মুজাদালাহ: ১১)

আলেমদের মর্যাদা: নবীদের উত্তরাধিকারী

১. নবীদের উত্তরাধিকারী (Warastatul Anbiya)

إِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ ، وَإِنَّ الْأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَمًا ، وَإِنَّمَا وَرَّثُوا الْعِلْمَ “নিশ্চয়ই আলেমগণ হলেন নবীদের উত্তরাধিকারী। আর নবীরা উত্তরাধিকার হিসেবে দিরহাম বা দিনার রেখে যাননি, বরং উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছেন ‘ইলম’ বা জ্ঞান।” — (আবু দাউদ ও তিরমিজি)

২. আলেমদের জন্য সৃষ্টিজগতের দোয়া

وَإِنَّ الْعَالِمَ لَيَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ حَتَّى الْحِيتَانُ فِي الْمَاء “জ্ঞানীর জন্য আসমান ও জমিনের সবাই এমনকি পানির মাছ পর্যন্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে।” — (ইবনে মাজাহ)

জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব

طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।” — (ইবনে মাজাহ)
مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ “যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” — (সহীহ মুসলিম)

কেন সমাজ ও জাতির জন্য আলেমদের প্রয়োজন?

  • সঠিক পথের দিশারী: বিভ্রান্তির সময়ে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক পথ বাতলে দেন।
  • হালাল-হারামের পার্থক্য: কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ, তা আলেমদের মাধ্যমেই জানা সম্ভব।
  • ফিতনা দমন: সমাজে ছড়িয়ে পড়া কুসংস্কার ও বিভ্রান্তি তারা ইলম দিয়ে খণ্ডন করেন।
  • আত্মিক পরিশুদ্ধি: মানুষের চরিত্র ও নৈতিকতা সংশোধনে ভূমিকা রাখেন।

উপসংহার: আলোর পথে যাত্রা

জ্ঞানহীন জাতি অন্ধ। আর আলেমশূন্য সমাজ মরা লাশের মতো। কুরআন ও হাদিস আমাদের বারবার জ্ঞান অন্বেষণের তাগিদ দিয়েছে। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং আলেমদের মর্যাদা বোঝার তৌফিক দান করুন। আমিন।

জিজ্ঞাসিত কিছু প্রশ্ন (FAQs)

প্রশ্ন ১: জ্ঞান অর্জন কি সবার জন্য ফরজ?
উত্তর: হ্যাঁ, দ্বীনের নূন্যতম জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ব্যক্তিগতভাবে ফরজ।

প্রশ্ন ২: আমরা আলেম চিনব কীভাবে?
উত্তর: প্রকৃত আলেম তিনি, যার জীবন ও কর্ম কুরআন-সুন্নাহর ছাঁচে গড়া এবং যিনি হক কথা বলতে ভয় পান না।

প্রশ্ন ৩: আধুনিক বিজ্ঞান শেখা কি ইসলামে জায়েজ?
উত্তর: অবশ্যই। মানবজাতির কল্যাণে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করাও প্রশংসনীয় ইবাদত।

Scroll to Top